শৈশবের সেই দিন - অধ্যায় ২ : চকলেটের বন্ধন
শৈশব এমন একটি সময়, যখন সম্পর্কগুলো তৈরি হয় কোনো যুক্তি ছাড়াই, কোনো হিসাব ছাড়াই।
একটি ছোট্ট মুহূর্ত, একটি নিরীহ অভ্যাস- কখন যে গভীর বন্ধনে পরিণত হয়, তা বোঝা যায় না।
“চকলেটের বন্ধন” ঠিক তেমনই এক গল্প, যেখানে একটি সাধারণ চকলেট হয়ে ওঠে দুই শিশুর নীরব বোঝাপড়ার প্রতীক।
এখানে আপনের ও জ্যোতির সম্পর্ক ধর্ম, সামাজিক বিভাজন বা কোনো বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে।
তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে- যেখানে এক টুকরো চকলেট হয়ে ওঠে বিশ্বাস, নির্ভরতা এবং বন্ধনের সূচনা।
অধ্যায়টিতে দেখা যায়, আপনের মনে অজান্তেই জ্যোতির জন্য এক ধরনের অপেক্ষা তৈরি হয়।জ্যোতির দেওয়া একটি চকলেট থেকে শুরু হয় তাদের ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস।
এই ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় এক নিঃশব্দ সম্পর্ক- যেখানে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কিন্তু গভীর বোঝাপড়া আছে।
একটি ছোট্ট আঁকা “আমরা”-এই সম্পর্কের সবচেয়ে সরল অথচ শক্তিশালী প্রকাশ হয়ে ওঠে।
শৈশবের সেই দিন - অধ্যায় ২ : চকলেটের বন্ধন
হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া
শৈশবের কিছু সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকে না।
ওগুলো কখনো ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না, কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েও নয়।
একদিন হঠাৎ করে জন্ম নেয়- তারপর নিঃশব্দে বড় হতে থাকে, যেন কেউ আলাদা করে খেয়ালই করছে না।
কিন্তু একসময় বুঝা যায়- ওগুলোই মনের অজান্তে সবচেয়ে গভীর হয়ে গেছে।
আপনের জীবনে জ্যোতির আগমনও তেমনই ছিল।
না কোনো পরিকল্পনা, না কোনো বিশেষ কারণ- তবু যেন খুব স্বাভাবিকভাবে, খুব সহজেই।
সেই প্রথম দিনের চকলেটটা আসলে কোনো বড় ঘটনা ছিল না।
কিন্তু পরে বুঝা গেল- ওটাই ছিল শুরু।
পরদিন আপন অকারণেই একটু আগে স্কুলে চলে এলো।
নিজেও ঠিক বুঝতে পারছিল না- এত তাড়াহুড়া করে আসার কারণ কী।
স্কুল তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। মাঠে দু-একজন ছেলেমেয়ে খেলছে, দূরে ঝাড়ুদার মেঝে পরিষ্কার করছে।
সবকিছু যেন ধীরে ধীরে শুরু হচ্ছে মাত্র।
আপন ক্লাসে ঢুকে বেঞ্চে বসে পড়ল। বই খুলে রাখল সামনে, কিন্তু পড়ায়ও মন নেই তার।
বারবার চোখ চলে যাচ্ছে দরজার দিকে।
কার জন্য অপেক্ষা করছে- এটা সে নিজেই স্পষ্ট করে বলতে পারছিল না, কিন্তু অনুভবটা পরিষ্কার ছিল।
কিছুক্ষণ পর জ্যোতি এল।
হালকা দৌড়ে, একটু হাঁপাতে হাঁপাতে। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে সেই চেনা উজ্জ্বলতা।
“তুমি এত সকালে?” -সে অবাক হয়ে বলল।
আপন একটু অপ্রস্তুত হেসে বলল,
“এমনিই…”
জ্যোতি কিছু না বলে বসে পড়ল। তারপর ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট্ট মোড়ক বের করল।
“এইটা তোমার জন্য।”
আপন অবাক হয়ে তাকাল,
“কি এটা?”
“চকলেট। কাল তুমি দিয়েছিলে, আজ আমি দিলাম।”
এই কথাটা খুব সাধারণভাবে বলা হয়েছিল।
কিন্তু আপনের ভেতরে কোথাও যেন আলতো করে একটা কিছু ছুঁয়ে গেল।
সে চকলেটটা হাতে নিল, কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মোড়ক খুলল।
চকলেট ভেঙে অর্ধেকটা জ্যোতির দিকে এগিয়ে দিল।
জ্যোতি একটু অবাক হয়ে বলল,
“এটা কেন দিচ্ছ?”
আপন খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“একসাথে খেলে ভালো লাগে।”
জ্যোতি কিছু বলল না।
শুধু চকলেটটা নিল, মুখে দিল, আর খুব আস্তে করে হেসে ফেলল।
তারপর বলল,
“তাহলে ঠিক আছে… আজ থেকে আমরা যা খাব, ভাগ করে খাব।”
এই কথাটা যেন কোনো নিয়মের মতো শোনাল।
কিন্তু আসলে সেটা ছিল না কোনো নিয়ম- ছিল একটা অদৃশ্য বোঝাপড়া।
তারপর থেকে প্রতিদিনই কিছু না কিছু ভাগ করে খাওয়া শুরু হলো।
কখনো চকলেট, কখনো বিস্কুট, কখনো'বা বাড়ির মিষ্টি।
খাবারগুলো আলাদা ছিল, কিন্তু মুহূর্তগুলো ছিল একই রকম-
সহজ, নির্ভার, অপ্রস্তুত আনন্দে ভরা।
একদিন টিফিনের সময় জ্যোতি ব্যাগ খুলে থেমে গেল।
মুখটা একটু বদলে গেল।
“আজ কিছু আনতে ভুলে গেছি…” সে আস্তে বলল।
আপন কোনো প্রশ্ন করল না।
নিজের টিফিনবক্সটা খুলে সামনে এগিয়ে দিল।
“তুমি খাও।”
জ্যোতি মাথা নাড়ল,
“না, তোমার তো কম পড়ে যাবে।”
“কম পড়লে সমস্যা নেই,” আপন বলল, যেন ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক।
জ্যোতি একটু চুপ করে তার দিকে তাকিয়েই রইল।
তারপর ধীরে ধীরে একটা টুকরো তুলে নিল।
খেতে খেতে বলল,
“তুমি না থাকলে আজ আমি কিছুই খেতে পারতাম না।”
এই কথাটা শুনে আপনের মনের ভেতরে কেমন যেন নরম একটা অনুভূতি হলো।
কেউ তার ওপর নির্ভর করছে- এই ছোট্ট উপলব্ধিটাই তার কাছে অদ্ভুত আনন্দের মতো লাগল।
দিনগুলো এভাবেই এগোতে লাগল।
একদিন ক্লাসে শিক্ষক পড়াচ্ছেন, আর জ্যোতি খাতায় কিছু আঁকছে।
আপন কৌতূহল নিয়ে তাকাল।
“কি আঁকছ?” সে ফিসফিস করে বলল।
জ্যোতি খাতাটা একটু ঘুরিয়ে দেখাল।
দুটো ছোট্ট মানুষ- একটা ছেলে, একটা মেয়ে।
মাঝখানে একটা গোল জিনিস- চকলেট।
উপরে ছোট করে লেখা-
“আমরা”
আপন কিছুক্ষণ কিছু বলতে পারল না।
এত সহজ একটা আঁকা, অথচ এর ভেতরে যেন অনেক কিছু বলা আছে।
সে বুঝতে পারল না ঠিক কী অনুভব করছে, কিন্তু মনে হলো- এই মুহূর্তটা বড় বেশী ভালো লাগার- যা সে অনেকদিন মনে রাখবে।
সেদিন স্কুল ছুটির পর তারা একসাথে হাঁটছিল।
হঠাৎ জ্যোতি বলল,
“একদিন যদি তুমি না বলে স্কুলে না আসো, আমি কিন্তু রাগ করব।”
আপন একটু হেসে বলল,
“আমি তো এমন করি না।”
“তবু… যদি করো?”
আপন একটু ভেবে বলল,
“তাহলে তুমি রাগ করবে?"
জ্যোতি হেসে বলল,
“আমি শুধু রাগ করব না, কথাও বলব না।”
এই কথাটা খুব হালকা ছিল, কিন্তু আপনের মনে সেটা গেঁথে গেল।
কথা না বলা- এটা তার কাছে অদ্ভুত কঠিন মনে হলো।
সেদিন রাতে, ঘুমানোর আগে, আপন পকেট থেকে সেই চকলেটের মোড়কটা বের করল।
কী ভেবে যেন ফেলে দেয়নি।
সে অনেকক্ষণ সেটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
তার মনে হচ্ছিল- এটা শুধু একটা মোড়ক না।
এটার ভেতরে যেন একটা সময় আটকে আছে, একটা অনুভূতি, একটা সম্পর্ক।
বাইরে চাঁদের আলো পড়েছে উঠোনে।
হালকা বাতাস বইছে।
আর ভেতরে- একটি ছোট্ট হৃদয়ের গভীরে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে
একটা অদ্ভুত, নির্ভরশীল, নিঃশব্দ বন্ধন।
যার শুরুটা ছিল-
খুবই সাধারণ,
এক টুকরো চকলেট দিয়ে।
চলবে...
এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়- সবচেয়ে গভীর সম্পর্কগুলো কখনো শব্দে প্রকাশ পায় না, তারা শুধু অনুভবে বেঁচে থাকে।
FAQ Section:
❓ এই গল্পের মূল বার্তা কী?
শৈশবের নির্ভেজাল সম্পর্কই সবচেয়ে সত্য ও গভীর- যেখানে কোনো স্বার্থ থাকে না।
❓ “চকলেটের বন্ধন” কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ এটি একটি ছোট্ট ঘটনার মাধ্যমে বড় একটি আবেগ ও মানবিক সম্পর্ককে তুলে ধরে।
❓ গল্পটি কোন ধরনের পাঠকের জন্য?
যারা আবেগময়, বাস্তবধর্মী এবং স্মৃতিময় গল্প পছন্দ করেন।
❓ এটি কি বাস্তব জীবনের গল্প?
গল্পটি বাস্তব অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্মিত, যা পাঠকের সঙ্গে সহজেই সংযোগ তৈরি করে।
About Author Box
হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া একজন প্রখ্যাত বাংলা কবি, লেখক ও কনটেন্ট নির্মাতা।
তার লেখায় শৈশব, মানবিক সম্পর্ক, আবেগ এবং বাস্তব জীবনের গভীরতা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়।
তিনি বাংলা সাহিত্যকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন- বিশেষ করে আবেগময় গল্প, কবিতা এবং জীবনঘনিষ্ঠ লেখার মাধ্যমে।
March 27, 2026
© Hossain Mohammed Murad Meah
All Rights Reserved.
Follow my facebook page:
https://www.facebook.com/share/14YQTtgFsJX/
উপন্যাসের ১ম অধ্যায় পড়ুন এখানে :
[https://www.muraderkolom.com/2026/03/blog-post_67.html]
