শৈশবের সেই দিন

 

উপন্যাস-শৈশবের সেই দিন

  শৈশব মানেই এক মুঠো রোদ্দুর আর অমলিন কিছু স্মৃতি। সেই হারানো দিনগুলোর গল্প নিয়ে লেখক হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া শুরু করেছেন তার নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস ‘শৈশবের সেই দিন’। আজ আপনাদের জন্য থাকছে এই উপন্যাসের প্রথম পর্ব বা অধ্যায়।

​উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ও সারসংক্ষেপ:

​একটি সাধারণ গ্রামের স্কুল, মাটির সোঁদা গন্ধ আর এক চিলতে কৌতূহল- এসব নিয়েই বেড়ে ওঠা কিশোর আপনের। কিন্তু জীবনের ছকটা বদলে যায় যখন ক্লাসে নতুন এক মুখ হয়ে আসে ‘জ্যোতি’। এই অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে তাদের সেই প্রথম দেখা, প্রথম কথা এবং এক অদ্ভুত ভালো লাগার মুহূর্ত, যা থেকে জন্ম নেয় এক নির্মল নিঃশব্দ বন্ধন।

শৈশবের সেই দিন 

-হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া

🟢 অধ্যায় ১: প্রথম পরিচয়

গ্রামের স্কুলটি খুব বড় কিছু ছিল না- দুই তলা নয়, আধুনিকতার ছোঁয়া নয়; বরং মাটির গন্ধমাখা একতলা ভবন, যার চারপাশে ছড়িয়ে ছিল কাঁঠাল, আম আর কদমগাছের ছায়া। সকালবেলার শিশিরভেজা ঘাসে পা রাখলে যেন মনে হতো পৃথিবীটা এখনো সম্পূর্ণ নিষ্পাপ, কোনো বিভাজনের রেখা তাকে স্পর্শ করেনি।

আপন তখন ক্লাস ফাইভের ছাত্র। বয়স কম, কিন্তু মন ছিল কৌতূহলে ভরা। বইয়ের অক্ষরগুলো তার কাছে ছিল একেকটা নতুন জগৎ, আর স্কুল মানেই ছিল বন্ধুদের সঙ্গে নির্ভেজাল হাসি। তবু, তার দিনগুলো ছিল একরকম নির্দিষ্ট- যতদিন না সেই একদিন এলো।

সেদিন ক্লাসে নতুন একটি মেয়ে এলো।
তার নাম- জ্যোতি।

শিক্ষক যখন তাকে ক্লাসে পরিচয় করিয়ে দিলেন, তখন পুরো শ্রেণিকক্ষ যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। জ্যোতির চোখে ছিল এক ধরনের নির্ভীক স্বচ্ছতা, যেন সে পৃথিবীকে ভয় পায় না, আবার পুরোপুরি বুঝেও উঠতে পারেনি। তার চুলগুলো খোলা, হালকা বাতাসে দুলছিল, আর মুখে ছিল একটুকরো অচেনা হাসি- যা কাউকে আহ্বান করে, আবার দূরেও রাখে।

আপন প্রথমে তাকায়নি। কেন জানি, সে সবসময় নতুন মানুষের দিকে সরাসরি তাকাতে একটু সংকোচ বোধ করত। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, কিছুক্ষণ পর তার চোখ নিজে থেকেই চলে গেল জ্যোতির দিকে।

তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলেছিল।
সেই মিলন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত- তবু যেন তার ভেতরে কোথাও একটুখানি আলো জ্বলে উঠল। এমন কিছু, যার নাম তখনো সে জানত না।

জ্যোতিকে বসানো হলো আপনের পাশের বেঞ্চে।
“তোমার নাম কী?” জ্যোতি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল।
আপন একটু থেমে বলল, “আপন।”
“আপন মানে? তুমি কি সবারই আপন?”


জ্যোতির কণ্ঠে ছিল মৃদু খেলা।
আপন একটু লজ্জা পেল। উত্তর দিতে গিয়ে যেন কথাগুলো ঠিকঠাক বেরোতে চাইছিল না।
“না… মানে… আমার নামই আপন।”
জ্যোতি হেসে উঠল। সেই হাসি ছিল খুব জোরে নয়, আবার একেবারে চাপাও নয়- একটা মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা হাসি, যা শুনলে মনে হয়, পৃথিবীটা একটু সহজ হয়ে গেছে।

সেদিন টিফিনের সময়, আপনের মা তার জন্য যে ছোট্ট চকলেটটা দিয়েছিলেন, সেটা সে অনেকক্ষণ ধরে পকেটে রেখেছিল। খাবে কি খাবে না- এই দ্বিধায় ছিল।
হঠাৎ, জ্যোতি বলল, “তুমি কিছু খাচ্ছ না?”
আপন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পকেট থেকে চকলেটটা বের করল।
“এটা… তুমি খাবে?”
জ্যোতি একটুও দ্বিধা না করে চকলেটটা নিয়ে নিল।
“তুমি ভাগ করে খাও না?”
আপন মাথা নাড়ল, “আমি একাই খাই…”
“আজ থেকে না। আজ থেকে আমরা ভাগ করে খাব।”
এই ‘আমরা’ শব্দটা যেন আপনের কানে একটু বেশিই প্রতিধ্বনিত হলো।

সেদিন থেকে তাদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি, কোনো প্রতিশ্রুতি বিনিময় হয়নি- তবু অদৃশ্য এক সেতু তৈরি হয়ে গেল।
স্কুলের ছুটির পর তারা একসঙ্গে গেট পর্যন্ত হেঁটে যেত। কখনো কথা হতো, কখনো হতো না। কিন্তু নীরবতাটাও যেন অস্বস্তিকর ছিল না- বরং সেই নীরবতার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছিল এক অচেনা স্বাচ্ছন্দ্য।

আপন লক্ষ্য করল, জ্যোতি খুব সহজেই সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারে। কিন্তু তবু, প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে সে আপনের পাশে এসে বসে। যেন এই জায়গাটুকু তার জন্য নির্দিষ্ট।

একদিন বৃষ্টির মধ্যে স্কুল ছুটি হলো। সবাই দৌড়ে বাড়ি ফিরছিল। আপন ছাতাটা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না- দৌড়াবে, না ধীরে হাঁটবে।
জ্যোতি এসে বলল, “তোমার ছাতায় জায়গা হবে?”
আপন একটু থেমে বলল, “হবে।”
তারা পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। বৃষ্টির ফোঁটা ছাতার কিনারা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল, আর তাদের কাঁধ মাঝে মাঝে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
সেই স্পর্শে কোনো অস্বস্তি ছিল না- ছিল এক ধরনের নির্ভরতা।

সেদিন বাড়ি ফিরে আপন প্রথমবারের মতো অনুভব করল- তার দিনগুলো আর আগের মতো নেই।
কিছু একটা বদলে গেছে।
কিন্তু সেই পরিবর্তনের নাম তখনো তার জানা ছিল না।

রাতে ঘুমাতে গিয়ে সে হঠাৎ ভাবল- 
“যদি কাল জ্যোতি স্কুলে না আসে?”
এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু তার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি করল।
সেই প্রথম, আপনের জীবনে কেউ একজন এমনভাবে জায়গা করে নিল, যার অনুপস্থিতি কল্পনা করলেই তার মন অশান্ত হয়ে ওঠে।
বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছিল। কদমগাছের পাতা নড়ছিল ধীরে ধীরে।
আর ভেতরে, এক ছোট্ট ছেলের হৃদয়ে জন্ম নিচ্ছিল- 
একটি অচেনা, নির্মল, নিঃশব্দ বন্ধন।
👉 চলবে....."

​"বন্ধুরা, আপনের জীবনে জ্যোতির এই আগমন আর কী কী পরিবর্তন আনবে? জানতে চোখ রাখুন আমাদের ব্লগে। গল্পটি কেমন লাগলো কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না!"
🌹
March 17, 2026
© Hossain Mohammed Murad Meah
All Rights Reserved.

Follow my facebook page:
https://www.facebook.com/share/14YQTtgFsJX/

#উপন্যাস #Novel #Uponnas
#শৈশবের_সেই_দিন
#হোসাইন_মুহাম্মদ_মুরাদ_মিয়া
#HossainMohammedMuradMeah
#বাংলা_উপন্যাস #নতুন_গল্প #ধারাবাহিক_উপন্যাস #BanglaNovel #Storytelling #ChildhoodMemories

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url