Murader Kolom | Hossain Mohammed Murad Meah

উপন্যাস- "শৈশবের সেই দিন" | অধ্যায় ৩ : অপেক্ষার দিন

উপন্যাস- "শৈশবের সেই দিন"

অধ্যায় ৩ : অপেক্ষার দিন
একটি স্কুল বেঞ্চে একা বসে থাকা একটি শিশু, পাশে খালি জায়গা—অপেক্ষা ও একাকীত্বের আবেগময় দৃশ্য

অপেক্ষা—শব্দটি ছোট, কিন্তু এর অনুভূতি অনেক গভীর।

🟢 উপন্যাসের প্রেক্ষাপট:
এই অধ্যায়টি একটি সাধারণ স্কুলজীবনের ভেতর গড়ে ওঠা সম্পর্কের আবেগকে তুলে ধরে। আপন ও জ্যোতির বন্ধন ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ অনুপস্থিতি সেই বন্ধনের নতুন এক মাত্রা উন্মোচন করে। এখানে কোনো নাটকীয় ঘটনা নেই—আছে শুধুই প্রতিদিনের ছোট ছোট পরিবর্তন, যা হৃদয়ের ভেতরে বড় প্রভাব ফেলে।

📖 অধ্যায় ৩: অপেক্ষার দিন

কিছু অপেক্ষা খুব ছোট- কয়েক মিনিট, কয়েক ঘণ্টা। আবার কিছু অপেক্ষা এমন, যা সময়ের দৈর্ঘ্যে মাপা যায় না; বরং হৃদয়ের অস্থিরতায় তার পরিমাপ নির্ধারিত হয়। আপনের জীবনে অপেক্ষা শব্দটি ঠিক কখন গভীর অর্থ নিতে শুরু করল, সে নিজেও জানত না। তবে জ্যোতির সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই, প্রতিটি সকাল যেন এক অদৃশ্য প্রতীক্ষার ভিতর দিয়ে জন্ম নিতে লাগল। সেদিনও সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি, মাঠের ঘাসে শিশিরের নরম স্ফটিক জমে ছিল। আপন একটু তাড়াতাড়িই স্কুলে এসে পৌঁছাল। অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে- জ্যোতির আগেই এসে বসে থাকা। সে বেঞ্চে বসে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। প্রথম ঘণ্টা বাজল। কয়েকজন ছাত্রছাত্রী ঢুকল। কোলাহল ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। জ্যোতি এলো না। আপন প্রথমে বিষয়টা খুব একটা গুরুত্ব দিল না। হয়তো একটু দেরি হচ্ছে- এমন তো হতেই পারে। সে খাতা খুলে লিখতে শুরু করল, কিন্তু অক্ষরগুলো ঠিকঠাক বসছিল না। বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছিল দরজার দিকে। দ্বিতীয় ঘণ্টা বাজল। তবু জ্যোতি এলো না। এবার আপনের ভেতরে এক ধরনের অজানা অস্থিরতা জন্ম নিল। কোনো কারণ ছাড়াই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা লাগতে শুরু করল। সে নিজেকে বোঝাতে চাইল-“আজ না এলেই বা কী হয়েছে? কাল তো আসবে।” তবু এই যুক্তি তার মনকে শান্ত করতে পারল না। শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলেন, পড়া শুরু হলো। সবাই মন দিয়ে শুনছে, কিন্তু আপনের কানে যেন কিছুই পৌঁছাচ্ছে না। শব্দগুলো ভেসে আসছে, আবার হারিয়ে যাচ্ছে। তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে একটি প্রশ্নে- “জ্যোতি আজ কেন এলো না?” টিফিনের সময় সে পকেট থেকে চকলেট বের করল। আজ সে ইচ্ছে করেই একটা চকলেট এনেছিল- জ্যোতির জন্য। সে অনেকক্ষণ ধরে চকলেটটা হাতে নিয়ে বসে রইল। খুলবে কি খুলবে না- এই দ্বিধা নয়, বরং দেবে কাকে- এই প্রশ্নটাই আজ তার সামনে। শেষ পর্যন্ত সে চকলেটটা খুলল না। আবার পকেটে রেখে দিল। মনে হলো, এটা আজ খাওয়ার জন্য নয়। স্কুল ছুটি হলো। সবাই বেরিয়ে গেল, হাসতে হাসতে, দৌড়াতে দৌড়াতে। আপন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আজ সে গেট পর্যন্ত কাউকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটল না। গেটের কাছে এসে সে একবার পেছনে তাকাল- যেন কেউ হয়তো দৌড়ে আসবে, ডাকবে, বলবে- “এই, দাঁড়াও!” কেউ এলো না। সেদিন বাড়ি ফিরে আপনের মনটা খুব ভারী হয়ে রইল। মা কিছু জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু সে খুব বেশি কিছু বলল না। শুধু বলল- “আজ ভালো লাগেনি।” রাতে ঘুমাতে গিয়ে সে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। তার মাথায় বারবার একটা ছবিই ঘুরে ফিরে আসছিল- জ্যোতির খালি বেঞ্চ। পরদিন সকাল। আপন আরও আগে স্কুলে এলো। আজ সে নিশ্চিত ছিল- জ্যোতি আসবে। সে বেঞ্চে বসে রইল, ব্যাগ থেকে খাতা বের করল, আবার রেখে দিল। সময় যেন আজ একটু ধীর হয়ে গেছে। এক এক করে সবাই এলো। জ্যোতি এলো না। এবার আপনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল। যেন কিছু একটা ঠিক নেই। সে পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করল, “জ্যোতি আজও আসেনি?” ছেলেটা কাঁধ ঝাঁকাল, “জানি না।” এই ‘জানি না’ উত্তরটা যেন আরও বেশি অস্বস্তিকর। সেদিন ক্লাসে বসে থাকতে থাকতে আপনের মনে হলো- ক্লাসরুমটা যেন একটু বড় হয়ে গেছে, একটু ফাঁকা হয়ে গেছে। অথচ ছাত্রছাত্রী তো একই আছে। তাহলে এই শূন্যতা কোথা থেকে এলো? টিফিনের সময় আবার সেই চকলেট। আজও সে সেটা বের করল, কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর আবার রেখে দিল। দুই দিন কেটে গেল। তিন দিন। প্রতিদিন একই অপেক্ষা, একই অস্থিরতা, একই খালি বেঞ্চ। আপন এখন আর কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে না। সে শুধু চুপচাপ বসে থাকে, আর মাঝে মাঝে দরজার দিকে তাকায়। কখনো কখনো তার মনে হয়- হয়তো জ্যোতি হঠাৎ করেই ঢুকবে, আগের মতোই বলবে- “তুমি এত চুপচাপ কেন?” কিন্তু সেই মুহূর্ত আর আসে না। একদিন টিফিনের সময়, সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চকলেটটা বের করে ধীরে ধীরে খুলল। তারপর এক টুকরো ভেঙে মুখে দিল। স্বাদটা ঠিক আগের মতোই ছিল- মিষ্টি, পরিচিত। তবু আজ সেটা একদম আলাদা লাগছিল। কারণ আজ সেটা ভাগ করে খাওয়ার কেউ নেই। আপনের চোখে হঠাৎ পানি চলে এলো। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল, যেন কেউ দেখতে না পায়। তার মনে হলো, এই ছোট্ট একটা জিনিস- চকলেট- কীভাবে যেন তার জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে উঠেছে। আর সেই অংশটা আজ অসম্পূর্ণ। সেদিন স্কুল ছুটির পর, সে গেটের বাইরে একটু দাঁড়িয়ে রইল। কেন দাঁড়িয়ে আছে- সে নিজেও জানত না। হয়তো অভ্যাসে। হয়তো আশায়। হয়তো বিশ্বাসে- যে কেউ একজন হঠাৎ এসে দাঁড়াবে তার পাশে। কিন্তু সময় কেটে গেল, আলো ফিকে হয়ে এলো, আর গেটের সামনে ভিড় কমে গেল। আপন ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। তার পকেটে তখনো একটা চকলেট। অখাওয়া, অপ্রদত্ত, অপ্রয়োজনীয়। আর তার ভেতরে জমতে লাগল এক নতুন অনুভূতি- যার নাম সে তখনো জানত না। তবে সেটাই ছিল- অপেক্ষা। এবং সেই অপেক্ষার ভেতরেই, তাদের বন্ধনটি আরও গভীর, আরও নিঃশব্দ হয়ে উঠতে লাগল- কারণ কখনো কখনো, উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতিই সম্পর্ককে বেশি স্পষ্ট করে দেয়।
🌱🌼
চলবে...

🔷 FAQ Section

❓ এই অধ্যায়ের মূল থিম কী?
অপেক্ষা, অনুপস্থিতি এবং শৈশবের আবেগময় বন্ধনের গভীরতা।
❓ চকলেট এখানে কী প্রতীক করে?
এটি ভাগাভাগি, সম্পর্ক এবং অসম্পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
❓ গল্পটি কেন আবেগময়?
কারণ এটি বাস্তব জীবনের ছোট ছোট অনুভূতিকে গভীরভাবে তুলে ধরে।

✍️ লেখক: হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া

📚 কবি | লেখক | গল্পকার
🌿 মানবিক গল্প ও আবেগময় সাহিত্যচর্চায় নিবেদিত

হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া একজন সমকালীন বাংলা সাহিত্যিক, যিনি শৈশব, মানবিক সম্পর্ক এবং জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে সহজ অথচ গভীর ভাষায় তুলে ধরেন।

উপন্যাসের পূর্ব অধ্যায় পড়ুন: [https://www.muraderkolom.com/2026/03/blog-post_27.html]

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url