অস্পর্শ
অস্পর্শ
কলমেঃ হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া
[Hossain Mohammed Murad Meah]
রচনাকাল : ২৯ অক্টোবর ২০২৬ খ্রীঃ
![]() |
✦ ভূমিকা
কিছু কবিতা পড়ার জন্য নয় — কিছু কবিতা অনুভবের শূন্যতায় ডুবে যাওয়ার জন্য। অস্পর্শ ঠিক সেই শ্রেণির রচনা। হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়ার কলমে জন্ম নেওয়া এই কবিতাটি কেবল প্রেমের আখ্যান নয়; এটি দুটি সমান্তরাল অস্তিত্বের মধ্যবর্তী অগণিত দূরত্বের গাণিতিক হিসাব — যেখানে স্পর্শের চেয়ে স্পর্শের অনুপস্থিতি অধিকতর সত্য।
আধুনিক বাংলা কবিতার ধারায় অস্পর্শ কবিতা একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন। এখানে ভালোবাসাকে সেতু বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে "দুই গহ্বরের মধ্যবর্তী নিস্তব্ধ গণিত" — একটি এমন রূপক যা পাঠকের চেতনায় দীর্ঘ অনুরণন তৈরি করে। ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রচিত এই কবিতাটি muraderkolom-এর পাঠকদের জন্য এক অনন্য দার্শনিক অভিজ্ঞতার দ্বার উন্মোচন করবে।
✦ কবিতার প্রেক্ষাপট
প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে একটি নীরব মুহূর্ত থাকে — যে মুহূর্তে ভাষা হার মানে, আর শূন্যতা কথা বলে ওঠে। অস্পর্শ কবিতাটির জন্ম সেই মুহূর্ত থেকে। কবি যখন অনুভব করেন যে দুটি মানুষের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা স্পর্শে নয়, বরং স্পর্শের পরবর্তী শূন্যতায় লুকিয়ে থাকে — তখনই এই পংক্তিগুলোর আবির্ভাব।
সমান্তরাল রেখার মতো দুটি জীবন — যারা একই অসীমের দিকে ধাবিত, অথচ কখনো ছেদ করে না। এই জ্যামিতিক সত্যকে কবি রূপান্তরিত করেছেন আবেগের ভাষায়। ভালোবাসা এখানে আবেগের উচ্ছ্বাস নয়; এটি একটি নিস্তব্ধ সমীকরণ, যেখানে মাধ্যাকর্ষণ পর্যন্ত আত্মবিলোপে সম্মত।
✦ সারসংক্ষেপ
অস্পর্শ একটি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত ঘনবুনোটের দার্শনিক কবিতা। এখানে কবি দুটি সমান্তরাল অস্তিত্বের কথা বলেছেন — যারা একই শূন্যতায় শ্বাস নেয়, অথচ পরস্পরকে স্পর্শ করে না। ভালোবাসাকে সেতু না বলে "নিস্তব্ধ গণিত" আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কবির জিহ্বায় প্রিয়জনের নাম আগুনের জীবাশ্ম হয়ে জ্বলে, আর সেই ভস্মে 'সত্তা' শব্দটি নিজেই আত্মবিসর্জন দেয়। কবিতার চূড়ান্ত ঘোষণা — কবি প্রিয়জনকে স্পর্শ করেন না; তিনি স্পর্শ করেন স্পর্শের পরবর্তী শূন্যতাকে — সেই অন্তরালকে, যা স্পর্শের চেয়েও অধিক বাস্তব।
✦ মূল কবিতা ✦
অস্পর্শ
কলমেঃ হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া
[Hossain Mohammed Murad Meah]
রচনাকাল : ২৯ অক্টোবর ২০২৬ খ্রীঃ
আমরা - সমান্তরাল শূন্যের দীর্ঘশ্বাস,
ছেদহীন, তথাপি এক অসীমে শ্বাসরুদ্ধ।
তোমার নামে জিহ্বায় জন্ম নেয় অগ্নি-জীবাশ্ম;
সেই ভস্মে 'সত্তা' শব্দটি আত্মবিসর্জন দেয়।
ভালোবাসা সেতু নয়-
দুই গহ্বরের মধ্যবর্তী নিস্তব্ধ গণিত,
যেখানে মাধ্যাকর্ষণও আত্মবিলোপে সম্মত।
আমি তোমাকে স্পর্শ করি না;
স্পর্শের পরবর্তী শূন্যকে - কেবল সেই অন্তরালকে।
— © হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | www.muraderkolom.com
✦ সাহিত্যিক বিশ্লেষণ
অস্পর্শ কবিতাটি আধুনিক বাংলা মুক্তছন্দ কবিতার একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। এর ভাষাগত বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষণীয়:
রূপক ও প্রতীক
"সমান্তরাল শূন্যের দীর্ঘশ্বাস" — এখানে শূন্যতাকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার দীর্ঘশ্বাস আছে। "অগ্নি-জীবাশ্ম" একটি অসাধারণ যৌগিক রূপক — জীবাশ্ম যেমন অতীতের চিহ্ন বহন করে, তেমনি প্রিয়জনের নাম কবির জিহ্বায় এক প্রাচীন অগ্নির স্মৃতি হয়ে জ্বলে।
বিরোধালংকার
"ছেদহীন, তথাপি এক অসীমে শ্বাসরুদ্ধ" — এই পংক্তিতে বিপরীতধর্মী দুটি অবস্থা একসাথে সহাবস্থান করছে। সমান্তরাল রেখা ছেদ করে না, অথচ তারা একই অসীমে মিলিত — এটি গণিতের সত্য এবং আবেগের সত্যের এক অসাধারণ সমন্বয়।
ধ্বনিতাত্ত্বিক সৌন্দর্য
"স্পর্শ", "শূন্য", "শ্বাসরুদ্ধ", "সত্তা", "সেতু" — 'স' ও 'শ' ধ্বনির পুনরাবৃত্তি কবিতায় একটি ফিসফিসানি ও নিস্তব্ধতার আবহ তৈরি করে, যা বিষয়বস্তুর সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।
গঠনশৈলী
কবিতাটি একটি ক্রমবর্ধমান দার্শনিক উত্তেজনা অনুসরণ করে — প্রথমে সম্পর্কের সংজ্ঞা, তারপর নামের প্রভাব, তারপর ভালোবাসার পুনঃসংজ্ঞায়ন, এবং শেষে স্পর্শের অস্বীকার। এই গঠন পাঠককে ধীরে ধীরে একটি গভীরতর শূন্যতায় নিয়ে যায়।
✦ দার্শনিক বিশ্লেষণ
অস্পর্শ কবিতাটি অস্তিত্ববাদ (Existentialism) ও শূন্যতাবাদ (Nihilism)-এর সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে রচিত।
🔹 সত্তার বিলোপ
"সেই ভস্মে 'সত্তা' শব্দটি আত্মবিসর্জন দেয়" — এই পংক্তিটি হাইডেগারীয় Dasein-এর ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রিয়জনের নাম উচ্চারণের মুহূর্তেই কবির 'সত্তা' ভস্মীভূত হয় — অর্থাৎ, ভালোবাসা এখানে আত্মগঠনের নয়, আত্মবিলোপের প্রক্রিয়া।
🔹 মাধ্যাকর্ষণের আত্মবিলোপ
পদার্থবিজ্ঞানে মাধ্যাকর্ষণ হলো ভরের মধ্যে আকর্ষণের মৌলিক বল। কবি যখন বলেন "মাধ্যাকর্ষণও আত্মবিলোপে সম্মত", তখন তিনি প্রকৃতির সবচেয়ে মৌলিক নিয়মকেও অস্বীকার করছেন — এই দুটি সত্তার মধ্যে আকর্ষণ এতটাই নিঃশব্দ যে মহাকর্ষ পর্যন্ত নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
🔹 স্পর্শের অধিবিদ্যা
কবিতার শেষ দুটি পংক্তি দার্শনিকভাবে সবচেয়ে গভীর। কবি স্পর্শ করেন না প্রিয়জনকে — তিনি স্পর্শ করেন স্পর্শের পরবর্তী শূন্যতাকে। এটি জাঁ-লুক নঁসির Touching দর্শনের সাথে সংলাপে প্রবেশ করে — স্পর্শের প্রকৃত অর্থ কি স্পর্শিত বস্তু, নাকি স্পর্শের পর যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়? কবি দ্বিতীয়টিকে বেছে নেন।
✦ পাঠকের জন্য বার্তা
প্রিয় পাঠক, আপনি যদি কখনো কাউকে এতটা কাছে অনুভব করে থাকেন যে স্পর্শ করা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে — তাহলে এই কবিতাটি আপনার জন্য। অস্পর্শ আপনাকে শেখাবে যে দূরত্ব সবসময় বিচ্ছেদ নয়; কখনো কখনো দূরত্বই হলো সবচেয়ে গভীর সংযোগের ভাষা।
ভালোবাসা মানে সবসময় সেতু নির্মাণ নয়। কখনো কখনো দুটি গহ্বরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নীরবে হিসাব করা — সেই নীরব গণিতই ভালোবাসার সবচেয়ে সৎ রূপ। আপনার জীবনের সেই "অন্তরাল"কে চিনুন, সম্মান করুন, এবং অনুভব করুন।
✦ শেষ কথা
অস্পর্শ কবিতাটি যদি আপনার হৃদয়ের কোনো অস্পৃশ্য কোণে আঘাত করে থাকে, তবে এই অনুভূতিকে একা রাখবেন না।
🔹 কমেন্টে জানান — আপনার জীবনের "সমান্তরাল শূন্যতা"র গল্প কী?
🔹 শেয়ার করুন — সেই মানুষটির সাথে, যাকে আপনি স্পর্শ করেন না, অথচ স্পর্শের পরবর্তী শূন্যতায় প্রতিদিন অনুভব করেন।
🔹 অনুসরণ করুন — Facebook Page: Murader Kolom
🔹 বুকমার্ক করুন — www.muraderkolom.com — বাংলা সাহিত্যের নতুন স্বর।
✦ সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: "অস্পর্শ" কবিতাটি কার লেখা?
উত্তর: "অস্পর্শ" কবিতাটি তরুণ বাংলা কবি হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়ার লেখা। এটি ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রচিত এবং www.muraderkolom.com-এ প্রকাশিত।
প্রশ্ন ২: "অস্পর্শ" কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
উত্তর: কবিতাটির মূল বিষয় হলো ভালোবাসায় স্পর্শের অনুপস্থিতি, দুটি সমান্তরাল অস্তিত্বের মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং সত্তার আত্মবিলোপের দার্শনিক অনুসন্ধান।
প্রশ্ন ৩: কবিতায় "সমান্তরাল শূন্য" বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: "সমান্তরাল শূন্য" বলতে দুটি মানুষের এমন সহাবস্থানকে বোঝানো হয়েছে, যারা একই শূন্যতায় বিদ্যমান অথচ কখনো পরস্পরকে ছেদ করে না — ঠিক জ্যামিতির সমান্তরাল রেখার মতো।
প্রশ্ন ৪: "ভালোবাসা সেতু নয়" — এই উক্তির তাৎপর্য কী?
উত্তর: কবি প্রচলিত ধারণা ভেঙে বলছেন, ভালোবাসা দুটি মানুষকে সংযুক্ত করার সেতু নয়; বরং এটি দুটি গহ্বরের মাঝখানের নীরব গাণিতিক দূরত্ব — যা সংযোগের চেয়ে বিচ্ছেদকেই অধিক সত্য বলে স্বীকার করে।
প্রশ্ন ৫: কবিতায় "অগ্নি-জীবাশ্ম" রূপকটির অর্থ কী?
উত্তর: "অগ্নি-জীবাশ্ম" বলতে বোঝানো হয়েছে প্রিয়জনের নাম উচ্চারণের সময় জিহ্বায় যে প্রাচীন, জীবাশ্মীভূত আগুন জেগে ওঠে — এটি অতীতের দগ্ধ স্মৃতির প্রতীক।
প্রশ্ন ৬: হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়ার কবিতা কোথায় পড়া যাবে?
উত্তর: তাঁর সকল মৌলিক কবিতা ও সাহিত্যকর্ম তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগ www.muraderkolom.com এবং ফেসবুক পেজ Murader Kolom-এ নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন ৭: "অস্পর্শ" কি একটি প্রেমের কবিতা?
উত্তর: হ্যাঁ এবং না। এটি প্রেমের কবিতা হলেও প্রচলিত প্রেমের কবিতার মতো নয়। এটি প্রেমের শূন্যতা, দূরত্ব ও আত্মবিলোপ নিয়ে লেখা একটি দার্শনিক-অস্তিত্ববাদী কবিতা।
প্রশ্ন ৮: কবিতার শেষে "স্পর্শের পরবর্তী শূন্য" বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: কবি বলছেন, তিনি প্রিয়জনকে স্পর্শ করেন না — তিনি স্পর্শ করেন সেই শূন্যতাকে, যা স্পর্শের পর তৈরি হয়। অর্থাৎ, স্পর্শের অভিজ্ঞতার চেয়ে স্পর্শের অনুপস্থিতির অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অধিকতর বাস্তব ও গভীর।
প্রশ্ন ৯: এই কবিতাটি কোন ধারার কবিতা?
উত্তর: এটি আধুনিক বাংলা মুক্তছন্দ কবিতা, যা অস্তিত্ববাদ, শূন্যতাবাদ ও অধিবিদ্যার দার্শনিক ধারায় রচিত।
প্রশ্ন ১০: "অস্পর্শ" কবিতাটি কি কপিরাইট সংরক্ষিত?
উত্তর: হ্যাঁ। কবিতাটির সর্বস্বত্ব কবি হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়ার কাছে সংরক্ষিত। অনুমতি ব্যতীত পুনঃপ্রকাশ, সম্পাদনা বা বাণিজ্যিক ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া
[Hossain Mohammed Murad Meah]
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক নিভৃতচারী স্বর। দর্শন, শূন্যতা, অস্তিত্ব ও মানবিক আবেগের গভীরে ডুব দিয়ে যিনি শব্দ খোঁজেন — সেই শব্দ যা নীরবতাকেও ভাষা দেয়। তাঁর কবিতায় গণিত মিশে যায় আবেগে, পদার্থবিজ্ঞান হার মানে অধিবিদ্যার কাছে।
— এই রচনাটি হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়ার একান্ত মৌলিক সৃষ্টিকর্ম।
কবির লিখিত অনুমতি ছাড়া যেকোনো মাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ, অনুলিপি বা রূপান্তর আইনত দণ্ডনীয়।
সর্বস্বত্ব © ২০২৬ | muraderkolom.com
