পর হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প
পর হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প
কলমেঃ হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া
🔰 ভূমিকা
জীবনের কিছু সম্পর্ক শুরু হয় খুব নিঃশব্দে, কিন্তু শেষটা হয়ে যায় আরও নিঃশব্দ। আমরা অনেক সময় এমন কারো পাশে দাঁড়াই, যখন তার পাশে কেউ থাকে না। সেই সময়টা আমাদের উপস্থিতিই হয়ে ওঠে তার ভরসা।
কিন্তু সময় বদলায়। মানুষ বদলায় না—তাদের প্রয়োজন বদলায়। আর সেই বদলের ভেতরেই একসময় খুব আপন মানুষটিও হয়ে যায় অচেনা, দূরের… পর।
🌿 গল্পের প্রেক্ষাপট
এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুই সাধারণ মানুষ—যাদের সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না, কিন্তু গভীরতা ছিল অস্বীকার করার মতো নয়। একজন ছিল ভেঙে পড়া, একা, অবহেলিত। আরেকজন ছিল নীরব সঙ্গী—যে পাশে থেকেছে কোনো প্রতিদানের আশা ছাড়াই।
📌 সারসংক্ষেপ: পরিস্থিতি বদলায়, নতুন মানুষ আসে। কিন্তু সেই পুরোনো সঙ্গী, যে সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে ছিল—সে ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সম্পর্কটি কোথাও হারিয়ে যায় না—শুধু অবস্থান বদলায়।
বিকেলের আলোটা তখন আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছিল। বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। নিচের রাস্তায় মানুষজন ফিরছে—কেউ বাজারের ব্যাগ হাতে, কেউবা ক্লান্ত শরীর টেনে।
মোবাইলটা টেবিলে রাখা। অনেকক্ষণ ধরেই স্ক্রিনটা জ্বলে ওঠেনি। হঠাৎ একটা নাম মনে পড়ল। তোমার নাম। আঙুলটা একটু এগিয়েও থেমে গেল। ডায়াল করলাম না।
তুমি আর আমি—আমাদের পরিচয়টা খুব সাধারণ ছিল। একই এলাকায় বড় হওয়া, একই রাস্তায় হেঁটে যাওয়া, মাঝেমধ্যে গল্প করা। তুমি ছিলে একটু চুপচাপ। আর আমি—শুনতাম। তোমার কষ্টের গল্প, তোমার না-পাওয়া, তোমার ভাঙা স্বপ্ন—সবই একসময় আমার কাছে জমা থাকত।
“সবাই চলে যায়, জানো?”
আমি একটু হেসে বলেছিলাম, “সবাই না।”
তুমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলে। তারপর খুব আস্তে বলেছিলে, “তুমি থাকবা?”
আমি উত্তর দেইনি। কিন্তু থাকতাম। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। তোমার কান্নার শব্দ, তোমার নীরবতা—সবকিছু পাশে। তারপর ধীরে ধীরে তোমার জীবন বদলাতে শুরু করল। নতুন মানুষ এলো, নতুন সুযোগ এলো, হাসি বাড়ল তোমার মুখে। আমি দূর থেকে দেখতাম। ভালো লাগত।
একদিন হঠাৎ তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল রাস্তায়। তুমি ছিলে কিছু মানুষের মাঝে—হাসছিলে, গল্প করছিল। আমাকে দেখে একটু থামলে। চোখে একটা চেনা ভাব এল, আবার মিলিয়েও গেল। “কেমন আছো?” তুমি জিজ্ঞেস করলে। আমি বললাম, “ভালো।” তুমি মাথা নেড়ে আবার ওদের দিকে ফিরলে।
আমার জায়গাটা আর আগের মতো নেই। মনে হচ্ছিল— যখন তোমার কেউ ছিল না, তখন ছিলাম আমি। এখন তোমার সব হয়েছে— শুধু পর হয়ে গেছি আমি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো? এতে আমার কোনো রাগ নেই। শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়— মানুষ বদলায় না, শুধু প্রয়োজন বদলায়।
মোবাইলটা আবার হাতে নিলাম। তোমার নামটা স্ক্রিনে ভেসে উঠল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর… স্ক্রিনটা নিভে গেল।
🌙 শেষ কথা
“সব সম্পর্কের শেষটা ঝগড়া বা ভাঙনের মধ্যে হয় না। কিছু সম্পর্ক নীরবেই শেষ হয়ে যায়—কোনো অভিযোগ ছাড়াই, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই।”
❓ FAQ
- এই গল্পের মূল বার্তা কী? সম্পর্কের পরিবর্তন অনেক সময় নিঃশব্দে ঘটে।
- গল্পটি কি বাস্তব? এটি বাস্তব অনুভূতি থেকে অনুপ্রাণিত।
- “পর হয়ে যাওয়া” মানে কী? খুব কাছের মানুষের ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যাওয়া।
👤 লেখক পরিচিতি
হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া একজন প্রখ্যাত বাংলা কবি ও লেখক। তাঁর লেখায় সহজ ভাষার ভেতর লুকিয়ে থাকে গভীর জীবনবোধ।
কলমে— হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া
“শব্দে আমি বাঁচি, অনুভবে আমি লিখি।”
