হারানো আগুনের আঁচ
হারানো আগুনের আঁচ: চড়ুইভাতির স্মৃতিতে জীবনের গভীর দর্শন
শৈশব মানেই এক মুঠো রোদ্দুর আর এক চিমটি কল্পনা। আমাদের সবার জীবনেই এমন কিছু স্মৃতি থাকে যা ধুলোবালি মাখা হলেও হীরের চেয়ে দামি। তেমনই এক অমলিন স্মৃতি হলো চড়ুইভাতি। লেখক ও কবি হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া তাঁর "হারানো আগুনের আঁচ" কবিতায় সেই চড়ুইভাতিকে কেবল একটি খেলা হিসেবে নয়, বরং জীবনের এক গভীর সত্য হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবিতার প্রেক্ষাপট ও সারসংক্ষেপ
যান্ত্রিকতার এই যুগে আমরা যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে দামি সিরামিকের থালায় আহার করি, তখন মনের কোনো এক কোণে ধোঁয়া ওঠা মাটির উনুনের সেই আধসেদ্ধ চালের ঘ্রাণ ঠিকই উঁকি দেয়। এই কবিতাটি মূলত সেই হারিয়ে যাওয়া সারল্য এবং বর্তমানের কৃত্রিমতার মধ্যকার এক মানসিক দ্বন্দ্ব থেকে জন্ম নিয়েছে।
কবিতাটিতে কবি দেখিয়েছেন, কীভাবে শৈশবের সেই চুরির চাল-ডালে মাখা রান্নায় কোনো ভেজাল ছিল না। বড় হওয়ার সাথে সাথে আমাদের আয়োজন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু কমেছে মানুষের সাথে মানুষের সেই আত্মিক সংযোগ।
হারানো আগুনের আঁচ
- হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া
সেদিন আর আজকের মধ্যে তফাৎ খুব সামান্যই-
কেবল মাটির উনুন থেকে ধোঁয়াটা এখন বুকের ভেতর উঠে আসে।
শৈশবে আমরা যখন চড়ুইভাতি খেলতাম,
চাল-ডাল চুরির মধ্যেও এক গভীর সততা ছিল;
একটা আস্ত সাম্রাজ্য জয় করে ফিরতাম
কালো হয়ে যাওয়া অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি হাতে।
রোদের রঙটা তখন ছিল কাঁচা হলুদের মতো,
আর ধুলোবালিগুলো ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মশলা।
আমাদের কোনো মেনুকার্ড ছিল না,
ছিল না কোনো তড়িৎ নিমন্ত্রণ;
শুধু ছিল ঝোপঝাড়ের আড়ালে এক টুকরো আদিম ঘরবাড়ি-
যেখানে ধোঁয়া চোখে লাগলে কান্না আসত ঠিকই,
কিন্তু সেই কান্নায় কোনো ভেজাল ছিল না।
এখন আমরা ডাইনিং টেবিলে নিখুঁত সব খাবার সাজাই,
কাঁচের পাত্রে আলো পড়ে ঝিলমিল করে ওঠে;
অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো-
সেই আধসেদ্ধ চালের ঘ্রাণ এই দামী পোলাওয়ে আর পাওয়া যায় না।
আমরা আসলে বড় হতে হতে ভুলেই গেছি যে,
পেট ভরার নাম তো আহার-
কিন্তু মন ভরার নাম ছিল চড়ুইভাতি।
জীবন আসলে একটা প্রকাণ্ড চড়ুইভাতিই তো-
কিছুক্ষণ আগুনের পাশে বসা, একটু হাসাহাসি,
তারপর ছাইটুকু ফেলে রেখে যার যার ঘরে ফিরে যাওয়া।
আসল চড়ুইভাতি তো রান্নায় ছিল না কোনোদিন,
ছিল একসাথে আগুনের পাশে বসার ওই স্পর্ধাটুকুতে।
এখন আগুন আছে ঠিকই,
কিন্তু পাশে বসে গল্প করার মানুষগুলো সব মরীচিকা।
আমরা ধোঁয়া থেকে বাঁচতে এখন এসির ঘরে লুকাই,
অথচ ভুলে যাই-
আগুন ছাড়া কোনোদিন কোনো কিছু সুস্বাদু হয় না;
না জীবন, না চড়ুইভাতি।
শেষ কথা: "হারানো আগুনের আঁচ" কবিতাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের প্রকৃত স্বাদ উপকরণে নয়, বরং আন্তরিকতায়। কবি হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়ার এই লেখনী পাঠকদের শৈশবের সেই রঙিন দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন (FAQ)
১. "হারানো আগুনের আঁচ" কবিতার মূল ভাব কী?
উত্তর: কবিতার মূল ভাব হলো শৈশবের সারল্য বনাম বর্তমানের কৃত্রিমতা।
২. এই কবিতার লেখক কে?
উত্তর: কবিতাটি লিখেছেন বিশিষ্ট লেখক ও কবি হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া।
হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া
Poet, Author, and Literary Person
মূর্ত জীবন দর্শন এবং শৈল্পিক শব্দশৈলীর এক অনন্য মিশেল তাঁর লেখনী। নিয়মিত সাহিত্য চর্চা ও ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করছেন তাঁর নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম "মুরাদের কলম"-এ।
হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া
